বাংলা সাহিত্যের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানা-খোঁজার জন্য দেশের সংবাদপত্রের চেয়ে আর কোনো ভালো মাধ্যম হয় না। সমাজের মুনাফাভোগী কবি যেমন পত্রিকায় লেখেন, যেমন লেখেন ক্ষ্যাপা কোনো প্রাবন্ধিক, যেমন লেখেন পেটিকোটের তলায় থাকা তাত্ত্বিক, তেমনি বেশ্যার দালাল বুদ্ধিজীবীও লেখেন। তাই সমাজের হেন কোনো স্তরের শব্দ-বাক্য-কথা নেই যা পত্রিকায় উঠে আসে না। সাম্প্রতিক সময়ের একটা উদাহরণ দেই। বাংলাদেশের অন্যতম কাগুজে পত্রিকা (কতকটা কাগুজে বাঘের মতোই তার আচরণ) প্রথম আলোর সাহিত্য পাতার এক কর্মী ‘Knocking at heavens door' গানটির অনুবাদ করেছিলেন ‘ঠক ঠক’ শব্দ ব্যবহার করে। এখন এই ‘ঠক ঠক’ দেখে অন্যরা কি ভাববেন তা আমি জানি না, এমনকি ওই সাহিত্যকর্মীকেও দোষ দেই না বা দিতে পারি না। বরংচ, এই ’ঠক ঠক’ আমাকে বুঝিয়ে দেয় যে, সমাজ এমন এক জায়গায় উপস্থিত যখন এই সমাজের মানুষের মধ্য থেকে সূক্ষ্ণ ভাবনা বা সূক্ষ্ণবোধ শেষ হয়ে ‘স্থূল’ ভাবনা জেকে বসেছে। কখনো যদি কোনো কারণে কোনো সূক্ষ্ণ ভাব এসেও যায়, তৎক্ষনাৎ যেন মাথা ঝাঁকি দিয়ে হলেও সেই ভাব থেকে বের হয়ে আসতে হবে বা ভয়ের চোটে ভাবনার রাজ্যে লাগায় ছুট। সূক্ষ্ণভাবে তার বড় ভয়, সেখানে ডুব দিতে তার প্রাণ যাবার শঙ্কা জাগে। অর্থাৎ সমাজ এখন ভীত-সন্তস্ত্র, তাই ওই পত্রিকাকর্মীর ‘ঠক ঠক’ আমাকে সামাজিক ভয়ের বার্তা শোনায়। কেন সমাজ ভয় পায় বা পাচ্ছে, সে আলাপ এখন করছি না। শুধু কলিম খানের ভাষায় বলি- জনগণই যখন ভণ্ড হয় তখন সম্প্রদায়ের সম্প্রদান করে দেয়া শক্তিতে শক্তিমান হয়ে কেউ যদি জনগণের বুকেই ছুরি বসায় তাতে তেমন কিছু বলার থাকে না। সেই বলা কওয়ার দিন অতীত হয়ে এখন ভয়ের সময়।
আমরা সকলে ভীত। যে অর্থেই বুঝুন না কেন, আমরা সকলেই ভীত-সন্তস্ত্র। যখন এই কথাগুলো লিখছি তার দুঘণ্টা আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন পত্রিকা মারফত জানতে পেরেছি যে, নিখোঁজ সাংবাদিক উৎপল দাশের সন্ধান পাওয়া গেছে প্রায় তিন মাস নিরুদ্দেশ থাকার পর। বাংলামেইলে আমরা সহকর্মী ছিল সে, বর্তমান পূর্বপশ্চিমেও সহকর্মী সে। জানি না, উৎপল কোথায় ছিল, কিংবা উৎপল জানাবে কিনা সে কোথায় ছিল এতোদিন। যেমনটা আরো অনেকে জানায়নি। কেন কেউ মুখ খুলছে না, তা উপরে ইতোমধ্যেই বলে ফেলেছি।
সংবাদপত্রের পাতায় পাতায় ভয়ের জুজুর বাস। এমন একটা পাতা পাওয়া যাবে না, যেখানে একটা ভয়জাত শব্দ পাওয়া যাবে না। ৭১ সাল পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশে ইত্তেফাক পত্রিকায় এক হত্যাকাণ্ডের শিরোনামে একটি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছিল। শব্দটি ছিল “আততায়ী”। অমুক ব্যক্তি আততায়ীর হাতে খুন; এই ছিল সংবাদটির শিরোনাম। মাত্র একটি শব্দ, কিন্তু এর যে তরঙ্গ তা আরো বহু শব্দের জন্ম দিয়ে দিল মানুষের মনে। কে এই আততায়ী? কেমন দেখতে সে? আততায়ীর রূপ কি? কেন আততায়ী হত্যা করে?...... এমন অনেক প্রশ্ন জনমনে হাজির। সকলের মধ্যেই প্রশ্ন। সেই প্রশ্নের কোনো উত্তর ছিল না পত্রিকার পাতায়, উত্তর ছিল না রাষ্ট্রের কাছে, উত্তর ছিল না কোনো লেফট-রাইট বুদ্ধিজীবীর কাছে। সকলেই এক ‘আততায়ী’ শব্দের কাছে চুপ হয়ে গেলেন।
অনেকদিন পত্রিকাজুরে আততায়ী বেশ দাপটের সাথেই রাজত্ব করলো। এরপর এলো নাইন ইলেভেন। এখানেও সেই আততায়ীই অনুপ্রবেশ করে বিমান নিয়ে টুইন টাওয়ারের দিকে। কে এই আততায়ী, এই প্রশ্নে যা যা বিশ্বে ঘটেছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। যা বলার প্রয়োজন মনে করছি তা হলো, নাইন ইলেভেনের পর বাংলাদেশের পত্রিকাগুলোতে ‘আততায়ী’ শব্দটা বাচ্চা প্রসব করতে শুরু করে। পিতা ’আততায়ী’ শব্দকারে কমে যেতে থাকে এবং সেই শূণ্যস্থানে জায়গা করে নিতে থাকে বাচ্চাস্য বাচ্চা ‘জঙ্গি’, ‘সন্ত্রাসী’, ‘জিহাদি’ জাতীয় শব্দগুলো। আততায়ী শব্দকে আরো নিখুত করে যতগুলো শব্দ ব্যবহার করা যায় তা করা শুরু হতে থাকলো। আজ এমন একটা দিন পাওয়া যাবে না, যেদিন পত্রিকায় ‘সন্ত্রাসী’, ‘জঙ্গি’, ‘জিহাদি’ শব্দগুলো পাওয়া যাবে না।
এই সন্ত্রাসী-জঙ্গি-জিহাদি এসব শব্দ এখন এমন রূপ পেয়েছে যে, শব্দগুলো ইউনিভার্সাল ভাব প্রকাশের গতি পেয়ে গেছে। এই শব্দগুলো মাথায় আসা মাত্রই মানুষের মনোজগতে আফগানিস্তান থেকে শুরু করে নানা সংঘাতের চিত্রপট চলে আসে। যদিও এর কোনো একটি সংঘাতের সঙ্গে শারিরীকভাবে যে পরিচিত না হলেও সংবাদপত্রের পাতায় প্রকাশিত খবর মারফত সে নিজেকেও এর হিস্যা ভাবা শুরু করে দিয়েছে অনেকদিন। তাইতো আমরা শুনতে পাই, আফগানিস্তান বা ইরাকে জিহাদ করতে গেছে বাংলাদেশে থেকে। কেন একজন বাঙাল অন্য এক জাতের জন্য দেশ ছেড়ে যুদ্ধ করতে যাচ্ছে, এই প্রশ্ন করতে গেলে আমরা যে সত্য উত্তর পাই তাতে কোনো দেশপ্রেম বা দায়িত্ববোধ থাকে না। যা পাওয়া যায় তা হলো, ধর্মীয় ফেনমেনার আবেগ ও মিডিয়ার প্রভাব।
বাংলাদেশের মিডিয়া নাইন ইলেভেনের পর যে শব্দ জন্ম দিয়েছে সন্ত্রাস চিহ্নিত করতে, তাতে নতুন আরেক শব্দ যুক্ত হয়েছে, ‘গুম’। কখন কে গুম হচ্ছেন বা হবেন বা বলা মুশকিল। গুম কারা করছে বা করাচ্ছে সে আলাপ নাই বা করলাম, কিন্তু আমি বলতে চাচ্ছি, গুম একটা বাণিজ্য। যাকে আমরা ইংরেজিতে বলতে পারি Fear Business, এই ভয়ের ব্যবসা শুধু বাংলাদেশেই না, বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ দেশে শুরু হয়েছে। থিসিস করতে গিয়ে পরিচয় এক মার্কিন বন্ধুর সঙ্গে, চলতি বছরের শুরুতে তার সাথে আলাপ হচ্ছিল বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে। তখন অ্যালেক্স আমাকে যা তথ্য দেয় তা রীতিমতো আমাকে অবাকই করে দেয় কিছু সময়ের জন্য। যে দেশকে প্রেসক্রিপশনের শিকার মানুষ গণতন্ত্রের উন্নত মডেল মনে করেন, খোদ সেই দেশেই প্রতিদিন অন্তত দশজন গুম হচ্ছে। অ্যালেক্সের সঙ্গে কথা হবার পর আরো কয়েকটি দেশের বন্ধুদের সাথে একই বিষয় নিয়ে আলাপ করতে গেলে, সেখানেও একই অবস্থা দেখতে পাই।
২০১১ সালের আরব বসন্তের কথা আশা করি এখনই মগজ থেকে চলে যায়নি মানুষের। এই আরব বসন্ত কতটা সফল বা কতটা ব্যর্থ তা আগামীর সময় বলার চেয়ে বর্তমানেই আলোচনা করা জরুরি। আরববসন্তে পৃথিবীর মিডিয়া এক নতুন কণ্ঠস্বর পেয়েছে সন্ত্রাসবাদকে বা ক্যাচালকে Mass এর মধ্য দিয়ে address করার। তিউনিশিয়া থেকে হংকং হয়ে বাংলাদেশে পর্যন্ত যতগুলো আন্দোলন হয়েছে আরববসন্তের হাত ধরে, তার সবখানেই জনগণই ভিলেন। একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, মোট জনগোষ্ঠির একটা অংশ (এরা শহুরে শিক্ষিত, শহুরে সুবিধাভোগীর জাত) যখন কার্যত সরকারের বিরুদ্ধাচার করে রাস্তায় নামে তখন শুরুতে ইস্যুকে কেন্দ্র করে মিডিয়া তাতে সমর্থন যোগায়। কিন্তু এই সমর্থনের মধ্য দিয়েই চলে আন্দোলনকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত থেকে শুরু করে খেয়ে ফেলার সর্বোচ্চ পায়তারা। কিছু শব্দ তুলে ধরছি নিউরনে আঘাত করার জন্য, 'Tahrir Square', 'Gonojagoron Monch', 'Democracy Square' ...এই যে শব্দগুলো তার প্রত্যেকটির সাথে বহু মানুষের সম্পৃক্ততা রয়েছে। মিডিয়া তার নিজের স্বার্থে একটা আংশিক জনগোষ্ঠির আন্দোলনকে নস্যাতের মধ্য দিয়ে বৃহত বার্তা পাঠানোর চেষ্টা করে। আর সেই বার্তা হলো, কাঠামোবাদিতা, মার্কেট-মিডিয়া-মিলিটারির এই সময়ে বহু মানুষের অংশগ্রহণের আন্দোলনও ব্যর্থ করে দেয়া যেতে পারে। আর এই ব্যর্থ করে দেয়ার মধ্য দিয়ে জনগোষ্ঠির মধ্যে আন্দোলনকে ঘিরে অবিশ্বাস তৈরি হয় যা ইতোমধ্যেই আমরা দেখতে পাচ্ছি। ঠিক এই অবিশ্বাসটাই যাতে তৈরি হয় তাই চেয়েছিল বিশ্ব মিডিয়া থেকে শুরু করে দেশের মিডিয়াগুলো।
ব্যক্তিগতভাবে আমি এই মিডিয়ার পক্ষে নই। যে একার্ণবের পথে আমরা হাটছি সেখানে এমন দিন আসন্ন যে মানুষ নিজেই হয়ে উঠবে তার সকল তথ্যের কেন্দ্র, তাকে অন্য কারো কাছে তথ্যের জন্য যেতে হবে না। আপনি আমি না ভাবলেও পোলার অপজিট ঘটে যেতে কতক্ষণ! আমাদের প্রতিদিনকার অজস্র কর্মকাণ্ডের মধ্যে এমন অনেক সম্ভাবনা আমি দেখতে পাই যাতে পৃথিবীর মানুষ তার নিজের দেশে ব্রহ্মাণ্ডকে অনুভব করবে। সেই অনুভূতি যত গাঢ় হতে শুরু করবে ততই মানুষের সূক্ষ্ণানুভূতির প্রকাশ ঘটবে। আর সেই প্রকাশে প্রকাশিত হবে আমাদের একার্ণব।
আমরা সকলে ভীত। যে অর্থেই বুঝুন না কেন, আমরা সকলেই ভীত-সন্তস্ত্র। যখন এই কথাগুলো লিখছি তার দুঘণ্টা আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন পত্রিকা মারফত জানতে পেরেছি যে, নিখোঁজ সাংবাদিক উৎপল দাশের সন্ধান পাওয়া গেছে প্রায় তিন মাস নিরুদ্দেশ থাকার পর। বাংলামেইলে আমরা সহকর্মী ছিল সে, বর্তমান পূর্বপশ্চিমেও সহকর্মী সে। জানি না, উৎপল কোথায় ছিল, কিংবা উৎপল জানাবে কিনা সে কোথায় ছিল এতোদিন। যেমনটা আরো অনেকে জানায়নি। কেন কেউ মুখ খুলছে না, তা উপরে ইতোমধ্যেই বলে ফেলেছি।
সংবাদপত্রের পাতায় পাতায় ভয়ের জুজুর বাস। এমন একটা পাতা পাওয়া যাবে না, যেখানে একটা ভয়জাত শব্দ পাওয়া যাবে না। ৭১ সাল পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশে ইত্তেফাক পত্রিকায় এক হত্যাকাণ্ডের শিরোনামে একটি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছিল। শব্দটি ছিল “আততায়ী”। অমুক ব্যক্তি আততায়ীর হাতে খুন; এই ছিল সংবাদটির শিরোনাম। মাত্র একটি শব্দ, কিন্তু এর যে তরঙ্গ তা আরো বহু শব্দের জন্ম দিয়ে দিল মানুষের মনে। কে এই আততায়ী? কেমন দেখতে সে? আততায়ীর রূপ কি? কেন আততায়ী হত্যা করে?...... এমন অনেক প্রশ্ন জনমনে হাজির। সকলের মধ্যেই প্রশ্ন। সেই প্রশ্নের কোনো উত্তর ছিল না পত্রিকার পাতায়, উত্তর ছিল না রাষ্ট্রের কাছে, উত্তর ছিল না কোনো লেফট-রাইট বুদ্ধিজীবীর কাছে। সকলেই এক ‘আততায়ী’ শব্দের কাছে চুপ হয়ে গেলেন।
অনেকদিন পত্রিকাজুরে আততায়ী বেশ দাপটের সাথেই রাজত্ব করলো। এরপর এলো নাইন ইলেভেন। এখানেও সেই আততায়ীই অনুপ্রবেশ করে বিমান নিয়ে টুইন টাওয়ারের দিকে। কে এই আততায়ী, এই প্রশ্নে যা যা বিশ্বে ঘটেছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। যা বলার প্রয়োজন মনে করছি তা হলো, নাইন ইলেভেনের পর বাংলাদেশের পত্রিকাগুলোতে ‘আততায়ী’ শব্দটা বাচ্চা প্রসব করতে শুরু করে। পিতা ’আততায়ী’ শব্দকারে কমে যেতে থাকে এবং সেই শূণ্যস্থানে জায়গা করে নিতে থাকে বাচ্চাস্য বাচ্চা ‘জঙ্গি’, ‘সন্ত্রাসী’, ‘জিহাদি’ জাতীয় শব্দগুলো। আততায়ী শব্দকে আরো নিখুত করে যতগুলো শব্দ ব্যবহার করা যায় তা করা শুরু হতে থাকলো। আজ এমন একটা দিন পাওয়া যাবে না, যেদিন পত্রিকায় ‘সন্ত্রাসী’, ‘জঙ্গি’, ‘জিহাদি’ শব্দগুলো পাওয়া যাবে না।
এই সন্ত্রাসী-জঙ্গি-জিহাদি এসব শব্দ এখন এমন রূপ পেয়েছে যে, শব্দগুলো ইউনিভার্সাল ভাব প্রকাশের গতি পেয়ে গেছে। এই শব্দগুলো মাথায় আসা মাত্রই মানুষের মনোজগতে আফগানিস্তান থেকে শুরু করে নানা সংঘাতের চিত্রপট চলে আসে। যদিও এর কোনো একটি সংঘাতের সঙ্গে শারিরীকভাবে যে পরিচিত না হলেও সংবাদপত্রের পাতায় প্রকাশিত খবর মারফত সে নিজেকেও এর হিস্যা ভাবা শুরু করে দিয়েছে অনেকদিন। তাইতো আমরা শুনতে পাই, আফগানিস্তান বা ইরাকে জিহাদ করতে গেছে বাংলাদেশে থেকে। কেন একজন বাঙাল অন্য এক জাতের জন্য দেশ ছেড়ে যুদ্ধ করতে যাচ্ছে, এই প্রশ্ন করতে গেলে আমরা যে সত্য উত্তর পাই তাতে কোনো দেশপ্রেম বা দায়িত্ববোধ থাকে না। যা পাওয়া যায় তা হলো, ধর্মীয় ফেনমেনার আবেগ ও মিডিয়ার প্রভাব।
বাংলাদেশের মিডিয়া নাইন ইলেভেনের পর যে শব্দ জন্ম দিয়েছে সন্ত্রাস চিহ্নিত করতে, তাতে নতুন আরেক শব্দ যুক্ত হয়েছে, ‘গুম’। কখন কে গুম হচ্ছেন বা হবেন বা বলা মুশকিল। গুম কারা করছে বা করাচ্ছে সে আলাপ নাই বা করলাম, কিন্তু আমি বলতে চাচ্ছি, গুম একটা বাণিজ্য। যাকে আমরা ইংরেজিতে বলতে পারি Fear Business, এই ভয়ের ব্যবসা শুধু বাংলাদেশেই না, বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ দেশে শুরু হয়েছে। থিসিস করতে গিয়ে পরিচয় এক মার্কিন বন্ধুর সঙ্গে, চলতি বছরের শুরুতে তার সাথে আলাপ হচ্ছিল বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে। তখন অ্যালেক্স আমাকে যা তথ্য দেয় তা রীতিমতো আমাকে অবাকই করে দেয় কিছু সময়ের জন্য। যে দেশকে প্রেসক্রিপশনের শিকার মানুষ গণতন্ত্রের উন্নত মডেল মনে করেন, খোদ সেই দেশেই প্রতিদিন অন্তত দশজন গুম হচ্ছে। অ্যালেক্সের সঙ্গে কথা হবার পর আরো কয়েকটি দেশের বন্ধুদের সাথে একই বিষয় নিয়ে আলাপ করতে গেলে, সেখানেও একই অবস্থা দেখতে পাই।
২০১১ সালের আরব বসন্তের কথা আশা করি এখনই মগজ থেকে চলে যায়নি মানুষের। এই আরব বসন্ত কতটা সফল বা কতটা ব্যর্থ তা আগামীর সময় বলার চেয়ে বর্তমানেই আলোচনা করা জরুরি। আরববসন্তে পৃথিবীর মিডিয়া এক নতুন কণ্ঠস্বর পেয়েছে সন্ত্রাসবাদকে বা ক্যাচালকে Mass এর মধ্য দিয়ে address করার। তিউনিশিয়া থেকে হংকং হয়ে বাংলাদেশে পর্যন্ত যতগুলো আন্দোলন হয়েছে আরববসন্তের হাত ধরে, তার সবখানেই জনগণই ভিলেন। একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, মোট জনগোষ্ঠির একটা অংশ (এরা শহুরে শিক্ষিত, শহুরে সুবিধাভোগীর জাত) যখন কার্যত সরকারের বিরুদ্ধাচার করে রাস্তায় নামে তখন শুরুতে ইস্যুকে কেন্দ্র করে মিডিয়া তাতে সমর্থন যোগায়। কিন্তু এই সমর্থনের মধ্য দিয়েই চলে আন্দোলনকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত থেকে শুরু করে খেয়ে ফেলার সর্বোচ্চ পায়তারা। কিছু শব্দ তুলে ধরছি নিউরনে আঘাত করার জন্য, 'Tahrir Square', 'Gonojagoron Monch', 'Democracy Square' ...এই যে শব্দগুলো তার প্রত্যেকটির সাথে বহু মানুষের সম্পৃক্ততা রয়েছে। মিডিয়া তার নিজের স্বার্থে একটা আংশিক জনগোষ্ঠির আন্দোলনকে নস্যাতের মধ্য দিয়ে বৃহত বার্তা পাঠানোর চেষ্টা করে। আর সেই বার্তা হলো, কাঠামোবাদিতা, মার্কেট-মিডিয়া-মিলিটারির এই সময়ে বহু মানুষের অংশগ্রহণের আন্দোলনও ব্যর্থ করে দেয়া যেতে পারে। আর এই ব্যর্থ করে দেয়ার মধ্য দিয়ে জনগোষ্ঠির মধ্যে আন্দোলনকে ঘিরে অবিশ্বাস তৈরি হয় যা ইতোমধ্যেই আমরা দেখতে পাচ্ছি। ঠিক এই অবিশ্বাসটাই যাতে তৈরি হয় তাই চেয়েছিল বিশ্ব মিডিয়া থেকে শুরু করে দেশের মিডিয়াগুলো।
ব্যক্তিগতভাবে আমি এই মিডিয়ার পক্ষে নই। যে একার্ণবের পথে আমরা হাটছি সেখানে এমন দিন আসন্ন যে মানুষ নিজেই হয়ে উঠবে তার সকল তথ্যের কেন্দ্র, তাকে অন্য কারো কাছে তথ্যের জন্য যেতে হবে না। আপনি আমি না ভাবলেও পোলার অপজিট ঘটে যেতে কতক্ষণ! আমাদের প্রতিদিনকার অজস্র কর্মকাণ্ডের মধ্যে এমন অনেক সম্ভাবনা আমি দেখতে পাই যাতে পৃথিবীর মানুষ তার নিজের দেশে ব্রহ্মাণ্ডকে অনুভব করবে। সেই অনুভূতি যত গাঢ় হতে শুরু করবে ততই মানুষের সূক্ষ্ণানুভূতির প্রকাশ ঘটবে। আর সেই প্রকাশে প্রকাশিত হবে আমাদের একার্ণব।



No comments:
Post a Comment